ভালোবাসা দিবসের শিক্ষা

ভালোবাসা দিবসে খুব বেশি মনে পড়ছে হাওয়াই দ্বীপের কথা। প্লেন থেকে নামার আগে দিগন্তের নীল আর প্রশান্ত মহাসাগরের সুনীল আস্তরণের স্মৃতি এখনো ভালোলাগার পরিসরে ব্যাপ্ত হয়ে আছে। কয়েকমাস আগের সেই ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করছি আজ ‘ভালোবাসা দিবসে’। কারণ ভালোবাসাকে নর-নারী সম্পর্কের মাপকাঠিতে বিচার করলে ইদানীং সেখানে আত্মত্যাগ ও সহিষ্ণুতার পরিবর্তে দেখা যায় ক্ষুদ্রতা আর সংকীর্ণতার জটাজাল। কেউ হয়ত কথা দিয়েছিল আজীবন পাশে থাকার কিংবা ‘তুমি আমার সব’, ‘তোমাকে ছাড়া আমি কিছু বুঝি না’— এসব কথা বলেও দেখা গেছে সেই পুরুষ অথবা নারী কেবল ভালোবাসার অভিনয় করে গেছে। ‘টাইম পাস’ করেছে কিংবা দিনের পর দিন একে অপরকে ফাঁকি দিয়ে ফেসবুক কিংবা ভিডিও কলে অন্যজনের সঙ্গে ‘চ্যাটে’ লিপ্ত থেকেছে। অথবা নিজের স্বার্থে বা নিজের কাজে ভালোবাসার মানুষটিকে ব্যবহার করে সুসময়ে দীর্ঘ সম্পর্কের ইতি টেনে দূরে চলে গেছে। এই যে বিশ্বাস ও আস্থার জায়গাটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনা তা এখন শহর থেকে গ্রামের অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে পড়েছে। বিস্তৃত হয়েছে স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে। এ ধরনের পরিস্থিতির মাঝে তাই বড় বেশি মনে পড়ছে প্রকৃতির শুশ্রূষার কথা। প্রকৃতির অভিনব ও প্রাণিত সজ্জার মধ্যে মানব জীবন আসলে বিচিত্র। মানুষের আচরণও নানা মাত্রিক।

মানুষের আচরণ যাই হোক না কেন, মঙ্গল চেতনার জয় গুরুত্ববহ। ভালোবাসাকে নিয়ে যেতে হবে সীমান্ত পেরিয়ে বহুত্ববাদী সংস্কৃতির দিকে, শান্তির মিছিলে। একাত্তরে সীমান্ত পেরিয়ে আমরা এককোটি মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলাম ভারতে। তাদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালে দশ লাখ রোহিঙ্গাকে এদেশে ঠাঁই দিয়ে মানবতার দিশারী হয়ে উঠেছেন। ১২ ফেব্রুয়ারি (২০১৯) উত্তর কোরিয়া আর দক্ষিণ কোরিয়ার পারস্পরিক যুদ্ধংদেহী মনোবৃত্তির মাঝেও দেখা গেল দু’দেশের সীমান্তের বিভেদ ছিন্ন করে মানবাত্মার জয়গান ঘোষিত হতে। অনেকদিন পর ভাই খুঁজে পেয়েছেন বোনকে। পিতা-মাতার স্মৃতি স্মরণে এসেছে চায়ের টেবিলে বসে। প্রার্থনায় নত হয়ে একে অপরের বাকি জীবনের মঙ্গল কামনা করেছেন তারা। এই যে মানব জীবনে ছোট ছোট আশার বসতি নির্মাণের প্রচেষ্টা- এই আলোকদীপ্ত প্রত্যাশা নিয়েই তো মানুষ বেঁচে থাকে।

ভালোবাসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দরকার ধৈর্য ও সহনশীলতা। কারণ ‘অহিংস’ উপায়ে প্রতারণা ও অন্যায়-অবিচারের নিরসন সম্ভব। প্রেমের শিক্ষা হচ্ছে মন্দতাকে উত্তমতা দিয়ে পরাজিত করা। এ উপায়ে একটি সমাজের পরিবর্তন খুব ত্বরান্বিত হয়। ব্যক্তি যদি এক এক করে ভালো হতে থাকে, প্রতিশোধ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাদ দিতে পারে, আর সমাজে আদর্শ সৃষ্টি করতে পারে, মন্দ ও দুষ্টরা দ্রুত পরিবর্তিত হবে। দুষ্টরা প্রতারণামূলক কাজ করতে নিরুত্সাহিত হবে, আর অন্যায় করার সাহস পাবে না। ব্যক্তির মিথ্যাচার যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সাহসিকতা ও ন্যায়বিচারকে ভয় পায় তারা। সমাজের অশান্তি ও অন্যায় সবকিছুই তো সকলের নজরে আসে। রাষ্ট্র ও সমাজই তো আসল ও সর্বশেষ বিচারক। আমরা নৈতিকতায় বিশ্বাস করি, অথচ নীতিশিক্ষা অনুসরণ করব না, তা হতে পারে না।

ভালোবাসা দিবসের শিক্ষা হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্র এবং ব্যক্তি কর্তৃক অন্যায় আচরণ ও প্রতারণা বন্ধ করার জন্য আদর্শ শিক্ষা অনুশীলন করা। যেখানে ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে, পাপী নয় পাপকে ঘৃণা করা হবে। মন্দকে উত্তমতা দেখানো, প্রতিশোধ না নেওয়ার মতো শিক্ষাগুলোকে একসাথে গ্রহণ করতে হবে। যেমন— আমরা ক্ষমা করলে, প্রতিশোধ নিতে পারি না। কারও জন্য প্রার্থনা করলে তার অমঙ্গল চাইতে পারি না। বিনম্রতা দেখালে সহিংস হতে পারি না। কাউকে প্রেম করলে ঘৃণা করতে পারি না। পবিত্র বাইবেলে রয়েছে, ‘মন্দের পরিশোধে কারও মন্দ করো না; সকল মানুষের দৃষ্টিতে যা উত্তম, ভেবে-চিন্তে তাই করো। যদি সাধ্য হয়, তোমাদের যত দূর হাত থাকে, মানুষ মাত্রের সাথে শান্তিতে থাক। হে প্রিয়েরা, তোমরা নিজেরা প্রতিশোধ নিও না, বরং ক্রোধের জন্য স্থান ছেড়ে দাও।’ তুমি মন্দের দ্বারা পরাজিত হবে না, কিন্তু উত্তমের দ্বারা মন্দকে পরাজিত করো।

ভালোবাসাকে স্থায়িত্ব দিতে হলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজে সত্ ও নীতিবান হতে হবে। এজন্য অন্যকে দায়ী করে নিজের দায়িত্বকে উপেক্ষা করা যাবে না। নৈতিকতা-সম্পন্ন সমাজ গঠনে ব্যক্তির দায়-দায়িত্বকে আমরা এড়িয়ে চলতে পারি না। সহ্য করার ক্ষমতা প্রথমে আমাদেরই থাকতে হবে। প্রকৃতপক্ষে এই দিবসের শিক্ষা হলো, প্রেম দিয়ে মানুষের হিংসাকে জয় করার শিক্ষা। মানুষ অহংকারের কারণে কোনো আঘাত সহ্য করতে পারে না। আঘাতপ্রাপ্ত হলে মনে করে সে অপমানিত হয়েছে ও ছোট হয়ে গেছে। কিন্তু বিনম্র ও প্রতিরোধ-বিমুখ ব্যক্তিরাই সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। দুষ্ট ও সবল লোক যদি সত্ ও দুর্বলের উপরে অত্যাচার ও চাপ প্রয়োগ করে, তাহলে প্রতিশোধ না নিয়ে সহ্য করা এ দিবসের শিক্ষা। কেননা প্রতারণাকারীরা সাময়িক সুখের জন্য সচেষ্ট থাকে; তবে তাদের উন্নতি ক্ষণস্থায়ী। সেজন্য ধৈর্য দেখাতে হবে জীবনে। সেই ধৈর্যই প্রেমকে অমরত্ব এনে দিতে পারে। অবশ্য নর-নারী সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতারণা ও হঠকারিতার মাঝে প্রকৃতির ঐশ্বর্য মানুষের স্বস্তির জন্য একটি জায়গা রেখে গেছে। সেখানে নীল দিগন্তে ভালোবাসার ছায়া অপূর্ব মহিমায় দীপ্যমান।

ড. মিল্টন বিশ্বাস , লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

লেখাটি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত: লিঙ্ক

Write a comment