মোহাম্মদ নাসিম : আদর্শ পিতার আদর্শ সন্তান

ড. মিল্টন বিশ্বাস।।

দুই বিশ্বস্ত সহযোদ্ধার করোনা-প্রয়াণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দেশবাসীর মনকে ব্যথিত ও আর্দ্র করে দিয়েছে। ১৩ ও ১৪ জুন (২০২০) যথাক্রমে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ নাসিম এবং ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহর মৃত্যুতে সংসদে আনা শোকপ্রস্তাবে আলোচনা করতে গিয়ে কেঁদেছেন প্রধানমন্ত্রী।তাঁর কান্না আমাদেরও ব্যাকুল করেছে। কারণ রাজনৈতিক জীবনে চলার পথ সহজ ছিল না উল্লেখ করে তিনি ওই দিন বলেছেন, ‘বারবার বাধা (পেয়েছি), কিন্তু যে কজন মানুষ সব সময় খুব পাশে থেকেছেন, প্রতিটি ক্ষেত্রে সমর্থন দিয়েছেন তাদের দুজন মানুষকে এক সঙ্গে হারালাম এটা সবচেয়ে কষ্টের।’প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে মোহাম্মদ নাসিমের পিতা জাতীয় চার নেতার অন্যতম ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর কথা স্মরণ করেন। আর তিনি যখন ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন তখন মোহাম্মদ নাসিম একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। সেসময় একটা প্রচেষ্টা ছিল জাতীয় চার শহীদ নেতার পরিবারগুলোর ছেলে মেয়েদের এক সঙ্গে নিয়ে আসা। আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং শক্তিশালী করা। এ কাজ করতে গিয়ে মোহাম্মদ নাসিমকে সব সময় তাঁর পাশে পেয়েছেন তিনি।বিরোধী দলে থাকার সময় বিভিন্ন শাসনামলে মোহাম্মদ নাসিমের ওপরে নির্যাতন করা হয়েছে।যা ছিল খুবই দুঃখজনক। অন্যদিকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহকেও দেশে ফিরে আসার পর থেকেই পাশে পেয়েছেন।শেখ হাসিনার নির্বাচন পরিচালনায় শুধু নয়, তাঁর নির্বাচনী এলাকার সম্পূর্ণ দেখাশোনা তাঁকেই করতে হতো। রাজনীতিতে অনেক কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছে গোপালগঞ্জবাসী। যখনই যারা ক্ষমতায় এসেছে, সেটা জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া; তাদের যেন একটা লক্ষই ছিল গোপালগঞ্জের ওপরে হাত দেওয়ার চেষ্টা। আওয়ামী লীগের বহু নেতা কর্মী নির্যাতিত হয়েছেন, তাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার হয়েছে। সেই দুঃসময়গুলিতে সংগঠনকে ধরে রাখা, সংগঠনের নেতা কর্মীদের দিকে নজর দেওয়া, এ কাজগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করে গেছেন আবদুল্লাহ সাহেব।শোকপ্রস্তাবের আলোচনা থেকে একথা স্পষ্ট যে বাংলাদেশে দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতাদের জন্যই দলীয় আদর্শ বজায় রয়েছে।একারণেই দলের নেতা কর্মীরা সিনিয়র নেতাদের আত্মত্যাগের মহিমায় অনুপ্রাণিত হয়ে জনগণের কল্যাণে নিজেকে আত্মনিবেদন করতে সক্ষম। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিবারের ঐতিহ্যও একটি দেশের রাজনীতিকে তৈরি করতে সহায়তা করেছে। যেমন প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমের পারিবারিক ঐতিহ্য স্মরণ করা যেতে পারে।

২.

১৩ জুন প্রয়াত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলের মুখপাত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ নাসিম(১৯৪৮-২০২০)ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা।শেখ হাসিনা শোকবার্তায় বলেছেন, ‘পিতার মতোই মোহাম্মদ নাসিম আমৃত্যু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আর্দশকে ধারণ করেছেন, দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে গেছেন। সকল ঘাত-প্রতিঘাত উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠায় তিনি অনন্য অবদান রেখেছেন। মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন দেশপ্রেমিক ও জনমানুষের নেতাকে হারাল।’

ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে খুন হলে মোহাম্মদ নাসিমের জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা।অথচ পিতার সূত্রে শৈশব থেকেই রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি। তারপর সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি- ছাত্রলীগ, যুবলীগ হয়ে আওয়ামী লীগ; অর্থাৎ দেশের রাজনীতির দীর্ঘ অধ্যায়জুড়ে ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম।

বিভিন্ন গ্রন্থসূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচয় গ্রহণ করলে আমরা বুঝতে পারব মোহাম্মদ নাসিম আদর্শ পিতার আদর্শ সন্তান হয়ে উঠেছিলেন কীভাবে।গণতন্ত্র ও বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধোত্তর স্বাধীন দেশ পুনর্গঠনে এবং আওয়ামী লীগকে জনগণের প্রাণপ্রিয় দলে পরিণত করার কর্মকাণ্ডে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার অবদান অবিস্মরণীয়। এঁদেরই অন্যতম হলেন ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী।তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল আত্মত্যাগে মহিমান্বিত।

বয়সে তাঁর চেয়ে বঙ্গবন্ধু ছোট হলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে জাতির পিতার প্রতি ছিল এম মনসুর আলীর(১৯১৭-১৯৭৫)গভীর আস্থা ও বিশ্বাস। ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অর্থনীতি বিষয়ে এম.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১৯৪৫ সালে। এল এল বি পাশ করেন  সেখান থেকেই। পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়া এই মানুষটি নিজের আদর্শ ও নীতি দিয়ে জনগণের সেবা করে গেছেন।

শিক্ষা জীবন শেষ করে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত মনসুর আলী পাবনা জেলা মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৪৮ সালে পি.এল জি’র ক্যাপ্টেন পদে অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি যশোর ক্যান্টনমেন্টে প্রশিক্ষণ নেন। এ সময় থেকেই তিনি ‘ক্যাপ্টেন মনসুর’ নামে পরিচিত হন। মনসুর আলী ১৯৫১ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন এবং আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেন। তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং দলের পাবনা জেলা কমিটির সভাপতি ছিলেন। ১৯৫২ সালে তিনি পাবনায় ভাষা আন্দোলন সংগঠনকালে গ্রেফতার হন। ১৯৫৪ সালে তিনি যুক্তফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পূর্ব বাংলা আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৫৬ সালে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন পূর্ববঙ্গ কোয়ালিশন সরকারের আইন ও সংসদ, খাদ্য ও কৃষি এবং বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে দেশে সামরিক শাসন জারি হলে তিনি নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হন এবং ১৯৫৯ সালের শেষের দিকে মুক্তিলাভ করেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয়দফা আন্দোলনে মনসুর আলী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০ সালে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হলে তিনি সে সময়ে সিরাজগঞ্জ মহকুমার কাজিপুর আসন থেকে প্রাদেশিক পরিষদে মনোনয়ন পান, জয়ীও হন। তখন থেকে নির্ভীক যোদ্ধা মোহাম্মদ নাসিম তাঁর রাজনৈতিক সান্নিধ্য লাভ করেন।১৯৭১ এর মার্চে অসহযোগ আন্দোলন পর্বে মনসুর আলী নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে (বর্তমানে মুজিবনগর) গঠিত হয় প্রবাসী সরকার। মনসুর আলী সেই সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন; আর মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় নির্ঘুম রাত্রি অতিবাহিত করেন দেশের কথা চিন্তা করে।

মনসুর আলী স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভায় যোগাযোগ মন্ত্রী এবং পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র ও যোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি দলের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি চালু হলে তিনি বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের (বাকশাল) সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন।

সরল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এই নেতার মুখে ছিল মনোগ্রাহী হাসি। ছিলেন আত্মবিশ্বাসী ও অকৃত্রিম দেশপ্রেমিক। তিনি জেলা পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মাঝে থেকে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে ভালবাসতেন।বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে খোন্দকার মোশতাক সরকার ১৯৭৫ সালের ২৩ আগস্ট তাঁকে গ্রেফতার করে। তার আগে প্রধানমন্ত্রীর পদ দিতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখান করেন। এতেই নির্ধারিত হয়ে যায় তাঁর নিয়তি। কারাগারে আটক অবস্থায় ৩ নভেম্বর অপর তিন নেতাসহ মনসুর আলীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।অর্থাৎ আপসহীন ও আত্মত্যাগী এই সহজ-সরল রাজনৈতিক মানুষটি ছিলেন প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমের পিতা।

৩.

বঙ্গবন্ধু ও পিতা মনসুর আলীর পথ অনুসরণ করে রাজনীতিতে সক্রিয় হন মোহাম্মদ নাসিম।ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় কর্মী তিনি জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখেন এবং স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন যখন তাঁর পিতা মন্ত্রী৷১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দুর্বিষহ জীবন কাটলেও তিনি জনগণের প্রতি পিতার আত্মত্যাগকে ভুলে থাকতে পারেননি। বরং কারাগার থেকে বের হয়ে রাজনীতিই হয়ে ওঠে তাঁর যাপিত জীবন।এরপর ১৯৮১ সালের সম্মেলনে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে যুব সম্পাদকের দায়িত্ব পান। শেখ হাসিনা সভাপতি হিসেবে দলের দায়িত্ব নেবার পর তিনি সার্বক্ষণিক তাঁর নেতৃত্বে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন সংগ্রামে শরিক হন। ১৯৮৭ সালে দলের প্রচার সম্পাদক হন নাসিম। ১৯৯২ ও ১৯৯৭ সালের সম্মেলনে পরপর দুবার সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন; ওই সময় দলে সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ একটি ছিল। ২০০২ ও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত দলের সম্মেলনে কার্যনির্বাহী কমিটির ১ নম্বর সদস্য পদে ছিলেন তিনি। এরপর ২০১২ সালের সম্মেলনে তাঁকে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। টানা তিন মেয়াদে তিনি এই দায়িত্ব পালন করছিলেন। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪–দলীয় জোটের মুখপাত্রের দায়িত্বে ছিলেন।

মোহাম্মদ নাসিম বারবার সংসদ সদস্য হয়েছেন এবং শেখ হাসিনা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। একসময় তিনি জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের হুইপ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।সিরাজগঞ্জ-১ (কাজীপুর ও সদর উপজেলার একাংশ) আসনটি ছিল তাঁর জন্য নির্দিষ্ট; সেখান থেকে তিনি ৬ বার সদস্য সদস্য  নির্বাচিত হন-১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০১৪ ও ২০১৮।সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মিথ্যা মামলার কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। ওই নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাঁর ছেলে তানভীর শাকিল সাংসদ নির্বাচিত হন। শেখ হাসিনা সরকারের আস্থাভাজন মন্ত্রী ছিলেন তিনি।

 ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী হন মোহাম্মদ নাসিম। পরের বছর আরও একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। ডাক ও টেলিযোগাযোগের পাশাপাশি তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। এরপর ১৯৯৯ সালে মন্ত্রিসভা রদবদল করা হলে তাঁকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের সরকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের মন্ত্রিসভায় তাঁকে রাখা হয়নি। তবে খাদ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয় তাঁকে।

৪.

উপরের বিবরণ থেকে পিতার পাশে পুত্রের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বিবেচনায় আনলে আমরা দেখতে পাই প্রয়াত নাসিম ছিলেন যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তাঁর বাবার মতোই বঙ্গবন্ধু পরিবারের আস্থাভাজন ছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর গ্রেপ্তার হন মোহাম্মদ নাসিম। অবশ্য প্রথম তাঁকে কারাগারে যেতে হয় ১৯৬৬ সালে, যখন তিনি এইচএসসি পড়ছিলেন। সেই সময় পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে ভুট্টা খাওয়ানোর চেষ্টার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে পিতা এম মনসুর আলীর সঙ্গে কারাগারে যেতে হয় মোহাম্মদ নাসিমকেও। একবছর পরে তিনি ছাড়া পান। ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিযানে আরো অনেক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়। সেই সময় অবৈধভাবে এক কোটি ২৬ লাখ টাকার সম্পদ অর্জন ও ২০ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মিথ্যা মামলায় বিশেষ জজ আদালত ২০০৭ সালে মোহাম্মদ নাসিমকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেয়। তবে ২০১০ সালে উচ্চ আদালত ওই সাজা ও মামলা বাতিল করে দেন। আগেই বলেছি, মামলায় সাজা হওয়ার কারণে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি মোহাম্মদ নাসিম। সেই আসনে তার ছেলে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন। মামলা ও সাজা উচ্চ আদালতে বাতিল হয়ে যাওয়ার পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।এছাড়া জনগণের ন্যায্য দাবি নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের কারণে বিভিন্ন সময় নির্যাতন সহ্য করেছেন। রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা ছিল মোহাম্মদ নাসিমের। তিনি ছিলেন পিতার মতোই মানবদরদী।জাতীয় দুর্যোগে ও সামাজিক সমস্যায় তিনি মানুষকে ইতিবাচক কথা শুনিয়ে অনুপ্রাণিত করতেন।

এক সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ নাসিম ডাকসু নির্বাচনের পর শিক্ষার্থীদের হানাহানির বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। তিনি নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক লাঞ্চনার প্রতিবাদ করেছেন। এমনকি আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে সংসদে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।বাংলাদেশে দমন-পীড়নের রাজনীতি শুরু হয়েছিল জিয়াউর রহমানের আমলে সে কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি।কারণ জিয়াউর রহমানের সময় সামরিক আইন জারি করে বি-রাজনীতিকরণের কাজ আরম্ভ হয়।ওই সময় সামরিক আইনের ফলে সন্ত্রাস বাড়ে, ছাত্রদের দিয়ে গুণ্ডামি করানো শুরু হয়৷ যা এরশাদের সময়েও অব্যাহত ছিল৷আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভুক্তভোগী ছিল তখন থেকে; দমন পীড়ন ছিল ভয়ঙ্কর।একসময় রাজনীতিকদের দমন করার জন্য এরশাদ-খালেদা জিয়া সব ধরনের পদক্ষেপই নিয়েছে৷ তবে সবচেয়ে বেশি দমনের রাজনীতি হয়েছে খালেদা জিয়ার আমলে।পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে সরকার তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছে, অনেককে বহিষ্কার করা হয়েছে।সরকারই কোনো ঘটনা ঘটলে দলীয় পরিচিতির চিন্তা বাদ দিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছে।

বিরোধী দলে থাকার সময় আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন সবচেয়ে বেশি।দিনের পর দিন নির্যাতিত হয়েছেন তারা।জননেত্রী শেখ হাসিনা কারারুদ্ধ হয়েছেন, তাঁকে ২১ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার সময় নির্যাতনের সকল মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল৷ অনেক নেতা, এমনকি এমপি খুন হয়েছেন৷দলের প্রত্যেক নেতাই নির্যাতিত হয়েছেন৷ আওয়ামী লীগের অফিসের সামনে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে রাখা হতো৷আর ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ঘটনা তো সকলের জানা আছে। আওয়ামী লীগের সরকার বিরোধী প্রতিবাদ কিংবা মিছিলে পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনা বারবার ঘটেছে।এরশাদের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীসহ দলের আন্দোলনে পুলিশ গুলি করে ছাত্রনেতাদের হত্যা করে৷ এমন ঘটনা অব্যাহত ছিল বিএনপি সরকারের আমলেও৷ ২০০৬ সালে কানসাটে বিদ্যুতের দাবিতে গণবিক্ষোভে ২০ জন নিহত হয়।অথচ শেখ হাসিনার সরকারের আমলে গণতন্ত্র আছে, সংসদে কথা বলার অধিকার পরিপূর্ণভাবে রয়েছে।মিডিয়া স্বাধীনভাবে কাজ করছে।এখন ইচ্ছেমতো সরকার সম্পর্কে মতামত লেখা যায়৷দলীয় নেতাকর্মীরা সচেতন; তারা প্রত্যেকটি নিপীড়ন ও অবাঞ্চিত ঘটনার নিন্দা জানান; পাশাপাশি ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।

একথা সত্য, ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে চাইলেও মোহাম্মদ নাসিমের মতো নেতার কারণে তারা প্রশ্রয় পান নি।শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে৷ ক্ষমতাকে ব্যবহার করে বাড়াবাড়ি অনেকেই করতে চেয়েছেন। কিন্তু তাঁর জন্য পারেননি।

তিনি চেয়েছেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধরে রাখতে।গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যত বেশি শক্তিশালী হবে ততই উত্তরণ ঘটবে দমন-পীড়ন এটা মনে করতেন তিনি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নির্যাতিত মানুষের পাশে থাকার কথাও ভেবেছেন সবসময়। এজন্য অনেক ঘটনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি।বুয়েটে ছাত্র হত্যার ঘটনায় ব্যবস্থা নেয়া হয় তাঁর জন্যই।তাঁর মতে, ছাত্রলীগের নামধারীরা এটা করেছে; তারা ছাত্রলীগ করে কিনা সন্দেহ আছে৷আসলে সরকার প্রধান শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশনাই পালন করে গেছেন তিনিও।যদিও বিরোধী দলে থাকার সময় মতাদর্শের কারণে আওয়ামী লীগ যেভাবে বিএনপি-জামায়াতের হামলায় নিপীড়নের শিকার হয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নাসিমের সময় সেরকম ঘটনা বিএনপি-জামায়াতের ক্ষেত্রে ঘটেনি। কারণ শক্তি প্রয়োগের রাজনীতি শেখ হাসিনা সরকার কখনো করেনি।পরিণতির কথা চিন্তা না করে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা যখন আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হন অর্থাৎ জনগণের দাবি আদায়ের জন্য আমাকে জেলখানায় যেতে হলেও যাব; মার খেতে হলেও খাব- এই আত্মপ্রত্যয় একসময় নাসিমের মতো প্রবীণরা তৈরি করে দিয়ে গেছেন।তরুণ সম্প্রদায়কে উৎসাহী করেছেন।এজন্যই তিনি যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান।

৫.

মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তাঁর শোক বার্তায় বলেছেন, মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিককে হারালো। আমাদের মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন নির্ভীক যোদ্ধা। তিনি জনগণের প্রিয় নেতা ছিলেন বলেই একাধিকবার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে এক অপূরণীয় ক্ষতি। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মোহাম্মদ নাসিমের নাম চির ভাস্বর হয়ে থাকবে।’

মূলত ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর মতোই তিনি সারাজীবন শুধু মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তাঁর পিতাকে যেমন এলাকার লোক দরকারের সময় পেতো, তেমনি তাকেও সিরাজগঞ্জের মানুষ যেকোনো দরকারে সবসময় কাছে পেয়েছে। প্রতিমাসে কয়েকবার তিনি এলাকায় যেতেন। তিনি বিদেশে থাকলেও ফোন করে এলাকার খোঁজখবর নিতেন। দলমত নির্বিশেষে সেখানকার সবাই জানেন, তার মতো নেতা পাওয়া কঠিন।শহীদ এ এইচ এম কামরুজ্জামানের ছেলে, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন বলেছেন-‘একাত্তর সালে মুক্তিসংগ্রামের সময় কলকাতায় আমরা এক বাড়িতে থাকতাম। জাতীয় চার নেতার পরিবারের মধ্যে আমরা তাকে আমাদের বড় ভাইয়ের মতো মনে করতাম। তিনিও সেভাবেই আমাদের খোঁজখবর রাখতেন। তাকে দেখেছি, যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশেও শক্ত মন নিয়ে দাঁড়াতে পারতেন, কর্মীদের চাঙ্গা করে তুলতে পারবেন। পরবর্তীতে প্রশাসক হিসাবেও তাকে সফল দেখতে পেয়েছি।’

পিতা মনসুর আলীর মতো জনদরদী রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ নাসিম ১৩ জুন প্রয়াত হয়েছেন কিন্তু তাঁর জীবন ও সেবার ধারা আগামী প্রজন্মের পাথেয়।প্রকৃতপক্ষে রাজনীতিতে নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে যে সাহস ও পরিপক্বতা দরকার তা তাঁর ছিল।নিজের পিতার মতোই তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি।রাজপথে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন কিন্তু পিছু হটেননি।এজন্য তাঁর নাম এদেশের ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে।  

(লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস,  বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-writermiltonbiswas@gmail.com)

https://www.jagonews24.com/m/opinion/article/590270?fbclid=IwAR0gxSNmOPeDTjxXRl0bpQVFHxL-H_ZTjjhPH1GqVcTJFOVpznD_YdfUcsw

Write a comment